বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক বিভ্রান্তির মত এই ভুল তথ্য ও প্রচলিত আছে যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলমানদের কোনো অবদান নেই। সব অবদান এককভাবে হিন্দুদের। আসল ইতিহাস চাপা পড়া, সত্য বলছে অন্য কথা। শুধু প্রাচীন আমলেই নয়; আধুনিক কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে মুসলমানদের বিশেষ করে আলেম সমাজের গৌরবময় অবদান ছিল এবং আছে।

মূলত বাংলা ভাষার জন্মই হয়েছে মুসলমানদের আগমনের মাধ্যমে। সংস্কৃত ভাষী হিন্দুদের অক্টোপাশের থাবা থেকে বাংলা ভাষা মুক্তি পায় ১২০৩ সালে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে। সেই অর্থে বলা যায় যে, মুসলিম শাসন কেবলমাত্র বাংলার মানুষদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকার দেয়নি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকেও স্বাধীনতা আর মুক্তি দিয়েছিল। ফলে দেখা যায় যে, মুসলিম আমলেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করেছিল। আর বাংলা ভাষাতে উঁচুমানের সাহিত্য রচনা করে মুসলমানরাই এই ভাষাকে বিশ্বে মর্যাদাশীল করেছিল।

পরবর্তীতে ইংরেজ শাসনামলে মুসলমানদের নিদারুণ শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন করা হয়। এ দেশের মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম আর ভাষা বাংলাকে চরমভাবে আক্রমণ করেছিল ক্ষমতাশীল ইংরেজ ও হিন্দু অপশক্তি। কিন্তু বাংলার মুসলমানরা আল্লাহর রহমতে নিজেদের ঈমানি শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে ধর্ম ও ভাষা তথা তাহযিব ও তমদ্দুনকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। ইংরেজদের কাছ থেকে উপমহাদেশ স্বাধীন হলে তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলা ভাষা আবার সমস্যার সম্মুখীন হয়। সে সময় বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বাংলা ভাষা-ভাষী মুসলমানদের ধর্ম-কর্ম সম্পন্ন করণের স্বার্থে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এদেশের ওলামায়ে কেরাম।

বাংলা ভাষার সঠিক ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আরও একটি শতাব্দী অতিক্রম করছে। শুধু কালের দিক থেকেই নয়, ইতিহাসের দিক থেকেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস দীর্ঘতম এক ইতিহাস। এই ইতিহাসের সাথে যুক্ত হয়ে আছে মুসলমানদের অবদানের প্রসঙ্গটিও। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের পরিবর্তে মুসলিম শাসন যখন বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই সূচিত হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পরিবর্তন। ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেছেন-
১২০৩ ঈসায়ীতে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনকে লখনৌ থেকে বিতাড়িত করে বাংলায় সংস্কৃত চর্চার মূলে কুঠারাঘাত হেনে বাংলা চর্চার পথ উন্মুক্ত করেন।

মূলত ১২০৩ সাল থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রযাত্রা শুরু। আর পলাশীর বিপর্যয় অর্থাৎ ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত এই সাড়ে পাঁচশ বছর ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপর ঘন কালোমেঘ। এই অশুভ কালোমেঘে বাংলা ভাষা সাহিত্যের সূর্য আচ্ছাদিত ছিল ততদিন, যতদিন না তাদের শাসন ও শোষণের অবসান ঘটেছে। পৃথিবীর আর কোন ভাষার উপর বাংলা ভাষার মত এত বিপর্যয় নেমে আসেনি। বাংলা ভাষা বারবার ধাক্কা খেয়েছে। আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তবুও আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি এই বাংলা ভাষাতেই শ্রেষ্ঠ ফসল ফলেছে । সন্দেহ নেই এর পেছনে অন্যতম অবদান ছিল মুসলমানদের।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যে ক্রমোন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে, এর মুখ্য কারণ হলো সচেতনশীল মুসলিম এবং মুসলিম শাসক ও ইসলাম প্রচারকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাঁরা বাংলাকে যেমন রাজনীতি এবং ধর্মপ্রচারের জন্য ঐক্যবদ্ধ, সুসংহত করেছেন ঠিক তেমনি তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় তখনকার লেখকদের হাতে অবহেলিত এবং মৃত প্রায় এই বাংলা ভাষা নব জীবন লাভ করেছে । পলাশীর বিপর্যয়ের পর মুসলিম শাসকেরা যেমন ক্ষমতা হারালেন, সেই সাথে বাংলা ভাষাও হয়ে পড়লো অভিভাবকহীন।

১৮১০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গ্রন্থমালা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইংরেজ ও ইংরেজ মদদপুষ্ট শিক্ষিত হিন্দু এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃত প-িতদের হাতে বাংলা ভাষা জিম্মি হয়ে পড়লো। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল সুযোগ সন্ধানী খ্রিষ্টান মিশনারীদের বহুমুখী অপকৌশল। মুসলমানদের তখন চলছিল রাজনৈতিক ভাবে চরম সংকটকাল। মাথা উঁচু করে দাড়ানোর ক্ষমতা তখনো তারা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। এই সুযোগে হিন্দু, ব্রাহ্মণ এবং খ্রিস্টানরা মুসলমানদের সযত্নে লালিত বাংলা ভাষার শরীর থেকে তাদের ঐতিহ্য মিশ্রিত শব্দকে ছুঁড়ে ফেলে সংস্কৃত নির্ভর এক ব্রাহ্মণ্য ভাষার জন্ম দিল। এই ভাষায় রচিত হল তাদের যাবতীয় গ্রন্থ এবং তা ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ করে ছড়িয়ে দিল সর্বত্র। গল্প, কবিতা, নাটক, অভিধান, ব্যাকরণসহ পাঠ্যপুস্তকের ভাষাও হয়ে গেল সংস্কৃত নির্ভর। সত্য বলতে কী, এই সংস্কৃত ভাষার নাগপাশ থেকে আজও আমরা সম্পূর্ণ মুক্ত নই। হিন্দু ব্রাহ্মণরা সচেতনভাবে যে সংস্কৃত ভাষার বীজ বপন করে গেছেন, আজকের অনেকেই তো সেই ভাষাই চর্চা করে যাচ্ছেন। পশ্চিম বাংলার হিন্দু লেখকরা যে ভাষা এদেশের মানুষকে শিখিয়েছেন এখনো এদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ চেতনে অবচেতনে সেই ভাষারই লালন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন।

অথচ আমাদের বোঝা উচিত যে, ভৌগোলিক দিক দিয়েই আমরা কেবল ভারত থেকে পৃথক নইÑ আমরা পৃথক ভাষা, সাহিত্য, জাতি, ধর্ম, ঐতিহ্য এবং আবেগের দিক দিয়েও। ভারতের সাথে আমাদের পার্থক্য সামান্য নয়; বরং আকাশ-পাতাল। এই পার্থক্য চিরন্তন এবং আদর্শিক।

পলাশীর প্রান্তরে মুসলমানদের যদি বিপর্যয় না ঘটতো এবং পরবর্তীতে আলেম সমাজের আযাদীর সংগ্রাম যদি বিজয়ী হতো, তাহলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস লেখা হত হয়তো বা অন্যভাবে। সংস্কৃত নয়, বরং বাংলা ভাষাই হতো হিন্দু-মুসলমানদের একক ভাষা। আমরা কেবল ক্ষমতাই হারাইনি, আমরা হারিয়েছি আমাদের ভাষা, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং আমাদের গৌরবগাথা ঐতিহ্য।

বাংলা ভাষার ওপর বারবার আঘাত এসেছে। তবুও শেষ পর্যন্ত এই মুসলমানরাই, এই ঐতিহ্যবাদী লেখকরাই আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাল ধরে এগিয়ে গেছেন। আর আজ পেছনে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ঐতিহ্যবাদী সেই সব সংগ্রামী অগ্রজেরা আমাদের জন্য নির্মাণ করে গেছেন একটি আলোকিত পর্বত। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পরিণতিতে বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমানদের অবদানের যে গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, সেটা সার্থক ভিত্তি পেয়েছিল এদেশের ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে।

সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের মতোই বাংলাদেশের মুসলমান, ইসলাম, তাহযিব, তমদ্দুন তথা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি কোনোভাবেই বিপদমুক্ত নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে এখানে শত্রুপক্ষ প্রবল। প্রবল শত্রুপক্ষকে পরাজিত করে বাংলাদেশের ইসলামী শক্তির বিজয়ের লক্ষ্যে সব সময় প্রেরণা পাওয়া যায় আমাদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে।

ফলে সঠিক অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে সত্য ইতিহাসকে চর্চা, প্রতিষ্ঠা ও প্রসার করতে হবে। আর গৌরবময় অতীতের হাত ধরে এভাবেই আমরা স্বর্ণালি ভবিষ্যৎ রচনা করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।

লেখক
কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ সম্পাদক
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন