সূরা ফাতিহার সপ্তম আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াত ‘আন’আমতা আলাইহিম’-এর ব্যাখ্যাবোধক। অর্থাৎ যাঁদেরকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর করুণা দানে ধন্য করেছেন, তারাই আল্লাহ’র গজব ও পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত বা সুরক্ষিত।

এই দু’টি আয়াতে মানুষের তিনটি দলের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। জীবন চলার পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ ৩টি দলে বিভক্ত। এক দল আল্লাহর পথ বেছে নেয় এবং আল্লাহর দেয়া জীবন-বিধান অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করে। এ দল সবসময় আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ ও দয়া লাভ করে। প্রথম দলের বিপরীতে আরেকটি দল রয়েছে যারা সত্য চেনার পরও আল্লাহকে ছেড়ে গায়রুল্লাহকে বেছে নিয়েছে এবং নিজের কামনা-বাসনা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ও সমাজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য দেয়। এ দলের লোকদের মধ্যে তাদের কৃতকর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে গেড়ে বসে এবং তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়। তারা আল্লাহর সান্নিধ্য এবং দয়া লাভের পরিবর্তে ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হয়, আর আল্লাহর গজবের মধ্যে পড়ে। এই আয়াতে এ দলকে “মাগযুবি আলাইহিম” বা ক্রোধনিপতিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তৃতীয় আরেকটি দল রয়েছে যাদের কোন সুনির্দিষ্ট পথ নেই এবং কোন পথে চলবে তা ঠিক করতে পারেনি। তারা দিগভ্রান্ত এবং বিভ্রান্ত।

এ আয়াতে তাদেরকে “যাল্লিন” বা পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা প্রতিদিন একেক পথ বেছে নেয় কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। প্রতিশোধ স্পৃহার উল্লাস ও উদ্দীপনার নাম গজব। কিন্তু এর সম্পর্ক যখন আল্লাহ’র সঙ্গে করা হয়, তখন তার মর্ম হবে গজবের পরিণাম বা পরিসমাপ্তি। ‘যালালাহ’ শব্দটি হেদায়েতের পথের বিপরীত অর্থবোধক শব্দ। অর্থাৎ যে পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায়, ঐ পথের প্রতি বিমুখতাই ‘যালালাহ’ বা পথভ্রষ্টতা। এখন একটি প্রশ্ন জাগে- ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট কারা? এর উত্তরে হজরত আদি বিন হাতেম রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যাদের প্রতি গজব অবতীর্ণ হয়েছে তারা ‘ইয়াহুদি’, আর যারা পথভ্রষ্ট তারা ‘খ্রিস্টান’। -তিরমিজী

উক্ত হাদিস দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যে- ‘মাগযুব আলাইহিম’ বলতে শুধু ইয়াহুদিরাই উদ্দেশ্য আর ‘যাল্লিন’ দ্বারা শুধু খ্রিস্টানরাই উদ্দেশ্য। বরং প্রত্যেক প্রকারের পথভ্রষ্ট, কাফের, ফাসেক, অবাধ্য, বেদাতী তাদের স্তর হিসেবে এর অন্তর্ভুক্ত। তাফসিরে মাযহারী’র লেখক মাওলানা সানাউল্লাহ পানিপথী রহ. বলেন, ‘গাইরিল মাগযুবি আলাইহিম ওয়ালায যাল্লিন’ অর্থাৎ অভিশপ্তÍ ও পথভ্রষ্ট- এ শব্দ দু’টিতে সাধারণভাবে সকল সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, অবাধ্য এবং বেদাতী সম্প্রদায় শামিল রয়েছে।

তাফসিরে মা‘আরিফুল কুরআনে এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে উল্লেখ রয়েছে- ‘মাগযুব আলাইহিম বলতে ঐ সকল লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে- যারা ধর্মের হুকুম-আহকামকে বুঝে-জানে, তবে স্বীয় অহমিকা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে বিরুদ্ধাচরণ করে। অন্য শব্দে বলা যায়- যারা আল্লাহ তা‘আলার আদেশ মান্য করতে গাফলতি করেছে। যেমন, সাধারণভাবে ইয়াহুদিদের নিয়ম ছিল, সামান্য স্বার্থের কারণে দীনের নিয়ম-নীতি বিসর্জন দিয়ে তারা নবী রাসুলগণের অবমাননা- এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করত না।

আর যাল্লিন তাদেরকে বলা হয়- যারা না বুঝে অজ্ঞতার দরুন ধর্মীয় ব্যাপারে ভুল পথের অনুসারী হয়েছে এবং ধর্মের সীমালঙ্ঘন করে অতিরঞ্জনের পথে অগ্রসর হয়েছে। যথা- নাসারাগণ। তারা নবীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদানের নামে বাড়াবাড়ি করে নবীদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।

সুতরাং আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে- আমরা সে পথ চাই না, যা নফসানী উদ্দেশ্যের অনুগত হয় এবং মন্দকাজে উদ্বুদ্ধ করে ধর্মের মধ্যে সীমালঙ্ঘনের প্রতি প্ররোচিত করে। সে পথও চাই না, যে পথ অজ্ঞতা ও মূর্খতার দরুন ধর্মের সীমারেখা অতিক্রম করে। বরং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সোজা-সরল পথ চাই। যার মধ্যে না অতিরঞ্জন আছে, আর না কম-কছুরী আছে এবং যা নফসানী প্রভাব ও সংশয়ের উর্ধ্বে।’ সুরা ফাতিহার পর নামজে ও নামাজের বাইরে আমিন বলা সুন্নাত। আমাদের হানাফি মাজহাবে নামাজে নীরবে আমিন বলতে হয়। আমিন- এর অর্থ হল ‘এরূপ করো’ অথবা ‘কবুল করো’। ‘আমিন’ এটা কুরআনের শব্দ নয়।

সূরা ফাতিহার আয়াত সাতটির তাফসির শেষ হয়েছে। এখন সমগ্র সূরার সারমর্ম হচ্ছে এ দোয়া- হে আল্লাহ্! আমাদিগকে সরল পথ দান করুন। কেননা সরল পথের সন্ধান লাভ করাই সবচেয়ে বড় জ্ঞান ও সর্বাপেক্ষা বড় সফলতা। বস্তুতঃ সরল পথের সন্ধানে ব্যর্থ হয়েই দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হয়েছে। অন্যথায় অ-মুসলমানদের মধ্যেও সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করার আগ্রহ-আকুতির অভাব নেই। এ জন্যই কুরআন শরিফে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় পদ্ধতিতেই সিরাতে মুস্তাকিমের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আর সূরায়ে ফাতিহাতে নবী-অলী’র পথকেই ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বলা হয়েছে। সূরা ফতিহাকে ‘উম্মুল কুরআন’ বলা হয়। যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা বুঝতে পারল সে গোটা কোরআন শরিফ ও ইসলামকে বুঝতে পারল।
(সমাপ্ত)

লেখক
মুফতি আবদুর রহমান গিলমান
সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন